ট্রাম্পের শুল্কচাপের মধ্যেও স্থিতিশীল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রফতানি

ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত উচ্চ শুল্ক সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রফতানি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত উচ্চ শুল্ক সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল রয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রফতানি। মার্কিন চাহিদা, কম উৎপাদন খরচ ও চীনা পণ্যের গতিপথ বদলে দেয়ার (রিরুটিং) মাধ্যমে রফতানি বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে সক্ষমতা দেখাচ্ছে অঞ্চলটি। বিশেষ করে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রধান অর্থনীতি সুবিধাগুলো নিচ্ছে। তবে ট্রাম্পের শুল্কনীতিতে পরিবর্তন ও চীনা কাঁচামালের ওপর নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা এ অঞ্চলের রফতানি বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা জিইয়ে রেখেছে। খবর এফটি।

মার্কিন সেনসাস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী রফতানি ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া অঞ্চলটির প্রধান শিল্পোৎপাদনকারী দেশগুলোয় বিদেশী বিনিয়োগ বেড়েছে। কারণ কোম্পানিগুলো সরবরাহ চেইন বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা করছে। এতে ট্রাম্পের ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কের প্রভাব কমে এসেছে।

গত এপ্রিলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শিল্পোৎপাদননির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর সর্বোচ্চ ৪৯ শতাংশ রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ঘোষণা করেন ট্রাম্প। যদিও পরে ওয়াশিংটন বাণিজ্য চুক্তির আওতায় শুল্ক প্রায় ২০ শতাংশে নামিয়ে আনে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইওয়াইয়ের ম্যাক্রো অ্যান্ড জিওস্ট্র্যাটেজি বিভাগের প্রধান ম্যাটস পারসন বলেন, ‘শুরুতে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন ছিল। তবে এশিয়ায় পণ্য উৎপাদনের খরচ কম হওয়ায় ২০ শতাংশ শুল্কের জন্য সরবরাহ চেইন পুনঃস্থাপন করা অর্থহীন।’

শুল্ক সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদন খরচ এখনো যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের তুলনায় ২০-১০০ শতাংশ সস্তা। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এ অঞ্চলে ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশল ব্যবহার শুরু করেন। ওই কৌশল প্রয়োগ করা কোম্পানিগুলো এখন সুবিধা পাচ্ছে। কারণ উচ্চ শুল্ক এড়াতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিকে দ্বিতীয় রফতানি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে কোম্পানিগুলো। পারসনের মতে, ‘এ কৌশল এখনো কার্যকর।’

অবশ্য ২০২৫ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রগামী রফতানি কমেছে ৪০ শতাংশ। একই সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মোট রফতানি স্থিতিশীল ছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন সেনসাস ব্যুরো।

শুরুতে কম্বোডিয়ার ওপর ৪৯ শতাংশ শুল্ক চাপানো হলেও পরে তা নেমে আসে ১৯ শতাংশে। দেশটির প্রধান রফতানি পণ্য হলো পোশাক। ট্রেড ডাটা মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের তুলনায় কম্বোডিয়া থেকে গত বছরের একই সময় নিটওয়্যার রফতানি ২৫ শতাংশ বেড়েছে।

কম্বোডিয়ার টেক্সটাইল, অ্যাপারেল, ফুটওয়্যার অ্যান্ড ট্র্যাভেল গুডস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল কেন লু বলেছেন, ‘ট্রাম্পের শুল্ক প্রথমে শিল্প খাতকে চাপের মধ্যে ফেলেছিল। কিন্তু সে উদ্বেগ কমে গেছে। কারণ বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার প্রতিযোগীরাও একই ধরনের শুল্কের মুখোমুখি হয়েছে।’

কেন লু আরো যোগ করেন, গ্রাহকরা শুল্কের প্রভাব কমাতে ছাড় চাইছে। ফলে মুনাফা মার্জিন সংকুচিত হচ্ছে।

কম্বোডিয়ায় বিদেশী কোম্পানিগুলোর নতুন বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে। গার্মেন্ট, ফুটওয়্যার ও ট্র্যাভেল গুডস শিল্পে মূল ভূখণ্ড চীন থেকে এসেছে নতুন বিনিয়োগের প্রায় ৯০ শতাংশ।

৩৭ শতাংশ রেসিপ্রোকাল শুল্ক সত্ত্বেও চীনের রিরুটিং ট্রেড বাড়ছে এবং যা গত সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ৩৭০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ক্যাপিটাল ইকোনমিকস। কম্বোডিয়া থেকে পরোক্ষ এ রফতানির সর্বোচ্চ বৃদ্ধি দেখা গেছে। সেপ্টেম্বরে চীনের পরোক্ষ রফতানির মূল্য বেড়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভিয়েতনামের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত গত বছরের প্রথম ১১ মাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ ১২ হাজার ১৬০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। থাইল্যান্ডে চীনা কাঁচামাল ও পণ্যের আমদানি অক্টোবরে ৩৪ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ৩৩ শতাংশ বেড়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। কারণ ট্রাম্প প্রশাসন পরোক্ষ রফতানিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার হুমকি দিয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুনঃরফতানির ওপর ৪০ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য হবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো চীনা কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্যের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ট্রাম্প প্রশাসন এ ইঙ্গিত দিয়েছে যে চূড়ান্ত পণ্যে বেশি চীনা উপাদান সহ্য করা হবে না।

অঞ্চলটির রফতানি স্থিতিশীলতার আরেকটি কারণ হলো মার্কিন প্রযুক্তি খাতে উল্লম্ফন। বিষয়টি উল্লেখ করে ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীনা বিশ্লেষক লিয়া ফাহি বলেন, ‘চিপ, চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার ও স্মার্টফোনের মতো প্রযুক্তি সম্পর্কিত অনেক রফতানি শুল্কের বাইরে রয়েছে।’

ভিয়েতনামে সাম্প্রতিক ভ্রমণের পর পরামর্শক সংস্থা গাভেকালের বিশ্লেষক টম মিলার বলেন, ‘বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখনো বিশ্বাস রাখছেন যে অঞ্চলটি বাণিজ্য যুদ্ধ পার করতে পারবে। তবে তা ট্রাম্প প্রশাসনের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে।’

আরও